
বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্প খাতের ইতিহাসে কিছু নাম থাকে যা কেবল ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং একটি বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পায়। "কৃষিবিদ গ্রুপ" তেমনি একটি নাম। ২০০১ সালে এক বুক স্বপ্ন আর পকেটে মাত্র ৩০,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা ২৫ বছরের এক গৌরবোজ্জ্বল রজত জয়ন্তী বা সিলভার জুবিলী উদযাপন করছে। এই ২৫ বছরে একটি ছোট্ট মুরগির খামার আজ পরিণত হয়েছে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার এক বিশাল শিল্পগোষ্ঠীতে।
এই ব্লগে আমরা কৃষিবিদ গ্রুপের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তর, এর পেছনের কারিগর এবং ২১০০ সাল পর্যন্ত তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত আলোচনা করব।
যেকোনো মহীরুহের জন্ম হয় একটি ছোট বীজ থেকে। কৃষিবিদ গ্রুপের ক্ষেত্রে সেই বীজটি ছিল "স্বপ্ন"। ২০০১ সালে যখন দেশে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার ধারণাটি খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না, তখন ৫ জন অদম্য সাহসী কৃষিবিদ একতাবদ্ধ হন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল মুনাফা অর্জন নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকে আধুনিকায়ন করা।
মাত্র ৩০,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে তারা একটি মুরগির খামার শুরু করেন। শুরুতে অনেক প্রতিকূলতা ছিল—পুঁজির অভাব, কারিগরি চ্যালেঞ্জ এবং বাজারজাতকরণের সমস্যা। কিন্তু তাদের ছিল সততা, মেধা এবং নিরলস পরিশ্রম। এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভর করেই তারা আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর নিজস্ব অডিটোরিয়ামে এক উৎসবমুখর পরিবেশে কৃষিবিদ গ্রুপের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান পালিত হয়। অনুষ্ঠানটি কেবল একটি উদযাপন ছিল না, বরং এটি ছিল এক প্রকারের পুনর্মিলন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গ্রুপের চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা কৃষিবিদ মু. তারিক হাসান। তার বক্তব্যে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশ গড়ার প্রত্যয়। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন গ্রুপের স্বপ্নদ্রষ্টা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রখ্যাত কৃষি বিজ্ঞানী ড. আলী আফজাল। তার হাত ধরেই কৃষিবিদ গ্রুপ আজকের এই বিশাল উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিএমডি কৃষিবিদ মো. আলমগীর, পরিচালক (প্রশাসন) কর্নেল (অব.) মেহের মহব্বত হোসেনসহ গ্রুপের কয়েক হাজার নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা। এই বিশাল মিলনমেলা প্রমাণ করে যে, কৃষিবিদ গ্রুপ কেবল একটি কোম্পানি নয়, এটি একটি পরিবার।
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তার জনবল। কৃষিবিদ গ্রুপ আজ গর্ব করে বলতে পারে যে, তাদের সাথে কাজ করছে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি অভিজ্ঞ পেশাদার।
বিশেষজ্ঞের সমাহার: এখানে কেবল সাধারণ কর্মী নন, বরং দেশের সেরা কৃষিবিদ, কৃষি বিজ্ঞানী, প্রাক্তন সচিব এবং প্রথিতযশা অধ্যাপকরা যুক্ত আছেন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: গত ২৫ বছরে এই গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরি: কৃষিবিদ গ্রুপ অসংখ্য তরুণকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এক বিরাট মাইলফলক।
বাজারে অনেক শিল্পগোষ্ঠী থাকলেও কৃষিবিদ গ্রুপ তার কর্মপদ্ধতি ও ভিশনের কারণে অনন্য।
৩০ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা—এই গাণিতিক উল্লম্ফন সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটি সঠিক বিনিয়োগ, বাজার বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকের আস্থার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিবিদ গ্রুপ শুরু থেকেই নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহে আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছে। পোল্ট্রি, ফিশারিজ, ডেইরি থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা গুণগত মান বজায় রাখছে।
কৃষিবিদ গ্রুপের অন্যতম শক্তি হলো তাদের গবেষণা বিভাগ। কৃষি বিজ্ঞানীরা নিয়মিতভাবে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন এবং চাষাবাদের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা সরাসরি কৃষকদের উপকৃত করছে।
কৃষিবিদ গ্রুপের সবচেয়ে সাহসী এবং দূরদর্শী দিক হলো তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। ড. আলী আফজাল যখন বলেন, "আমরা কেবল বর্তমান নিয়ে ভাবছি না; আমরা ভাবছি আগামী প্রজন্মের কথা", তখন সেটি কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি থাকে না।
বাংলাদেশ সরকারের 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিবিদ গ্রুপই দেশের প্রথম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা ২১০০ সাল পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক রোডম্যাপ তৈরি করেছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আলী আফজাল বলেন: "আমাদের লক্ষ্য ২১০০ সালে এই গ্রুপকে ৫ লক্ষ কোটি টাকার একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। আমরা এমন একটি ভিত্তি তৈরি করে যেতে চাই, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।"
এই ভিশন বাস্তবায়ন করতে তারা কাজ করছে স্মার্ট এগ্রিকালচার, ন্যানো টেকনোলজি এবং এআই (AI) চালিত কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর।
বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে কৃষিকে টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিবিদ গ্রুপ তাদের ভিশন ২১০০-এর মাধ্যমে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল, ভাসমান কৃষি এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। তারা বিশ্বাস করে, আগামী ১০০ বছর পর বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত রাষ্ট্র হবে, তখন সেই উন্নতির প্রধান কারিগর হবে আধুনিক কৃষি।
সাফল্যের এই চূড়ায় দাঁড়িয়ে কৃষিবিদ গ্রুপ তাদের শেকড়কে ভুলে যায়নি। রজত জয়ন্তীর এই শুভক্ষণে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে তাদের চার প্রধান অংশীদারের প্রতি:
১. গ্রাহক: যাদের আস্থায় কৃষিবিদ গ্রুপের পণ্য আজ প্রতিটি ঘরে ঘরে। ২. বিনিয়োগকারী: যারা প্রতিষ্ঠানের ভিশনের ওপর বিশ্বাস রেখে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। ৩. শুভাকাঙ্ক্ষী: যারা বিভিন্ন সময় পরামর্শ ও সমর্থন দিয়ে পাশে থেকেছেন। ৪. কর্মীদল: যাদের ঘাম আর মেধার বিনিময়ে আজ ১০ হাজার কোটি টাকার এই মহীরুহ দাঁড়িয়েছে।
আগামীর বাংলাদেশ হবে আরও সমৃদ্ধ, আরও স্বনির্ভর। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃষিবিদ গ্রুপ নিজেকে প্রস্তুত করছে নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে। তারা বিশ্বাস করে, কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে এবং সেই রপ্তানি বাজারে নেতৃত্ব দেবে কৃষিবিদ গ্রুপ।
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে কৃষিবিদ গ্রুপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।
কৃষিবিদ গ্রুপের ২৫ বছরের এই যাত্রা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, স্বপ্ন ছোট হতে পারে কিন্তু সংকল্প যদি দৃঢ় হয় তবে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। ৩০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হওয়া একটি মুরগির খামার আজ একটি মহীরুহ। আর এই মহীরুহের ছায়াতলে আজ হাজার হাজার মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে এবং দেশ পাচ্ছে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা।